সিলেট ২৯শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:২৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের দৃঢ়তাকে দীর্ঘদিন ধরে নিজের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে দুই নেতার মধ্যে দূরত্ব বাড়ার ইঙ্গিত, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী সমালোচনা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ওয়াশিংটনের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের কারণে সেই সম্পর্ক এখন আগের মতো শক্তিশালী নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়।
এমন প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল দুই নেতার প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আবারও জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া।
দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অভিজ্ঞতা এবং মার্কিন রাজনীতির সঙ্গে পরিচিতির কারণে নেতানিয়াহু অতীতে একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সেই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের পর।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, ইসরায়েলের মতামত ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটার ইঙ্গিত এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা বাড়ায় ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কেও টানাপোড়েনের আভাস মিলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে রাজি করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলের সাবেক কূটনীতিক অ্যালন পিনকাসের মতে, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য কূটনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক। তার ভাষায়, নেতানিয়াহু দেশে নিজের সমর্থকদের বোঝাতে চান যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনও অটুট। পাশাপাশি দুর্নীতির মামলায় ট্রাম্প আবারও প্রকাশ্যে তার পক্ষে অবস্থান নেবেন এমন প্রত্যাশাও থাকতে পারে।
আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর পাশাপাশি দুর্নীতির মামলাও মোকাবিলা করছেন নেতানিয়াহু। ফলে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বার্তা তার নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে নেতানিয়াহুর অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। রিপাবলিকান ঘরানার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসন ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেইলর গ্রিন প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করেছেন। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েলি সরকারের কিছু ব্যক্তি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, বর্তমানে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুকে আগের মতো ইতিবাচকভাবে দেখা হয় না। তার ভাষায়, অনেকেই মনে করেন ইরানের বিরুদ্ধে এমন এক যুদ্ধে ট্রাম্পকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন নেতানিয়াহু, যা পরে কৌশলগত সংকটে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি জনমত বিশ্লেষক এবং নেতানিয়াহুর সাবেক সহযোগী মিচেল বারাক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ সফল সম্পর্ক থাকলেও তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সেতুবন্ধন নষ্ট করেছেন। তার মতে, ট্রাম্প ভবিষ্যতে নেতানিয়াহুকে যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে প্রশংসা করলেও, ইসরায়েলের নতুন নেতৃত্বের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যদিও বৈঠকে প্রকাশ্যে কোনো মতবিরোধ দেখা যায়নি, তবুও বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় একমাত্র কার্যকর নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর অবস্থান এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে।