সুন্দরবনের উপকূলের বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে মহাবিপাকে সরকার

প্রকাশিত: ৭:৫৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২৬

সুন্দরবনের উপকূলের বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে মহাবিপাকে সরকার

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলঘেঁষা বাগেরহাটের রামপালে নির্মিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর কয়েক বছরের মধ্যেই বারবার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা।

 

একদিকে দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং, অন্যদিকে বিপুল বিনিয়োগ ও বিদেশি ঋণে নির্মিত রামপাল কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত—এই দ্বৈত সংকটে বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

 

১৬০ কোটি ডলারের ঋণ, সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জ

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় ১৬০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রটির মালিকানায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ভারতের এনটিপিসির অংশীদারিত্ব ৫০ শতাংশ করে।

 

চুক্তি অনুযায়ী, কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও নির্দিষ্ট হারে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের দায় রয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হলেও সরকারের আর্থিক দায় কমছে না।

 

উৎপাদন বাড়লেও কাটছে না সংকট

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে রামপাল কেন্দ্র ৮ হাজার ১২৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৫ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ইউনিট।

 

তবে প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় ১৪ টাকার বেশি হলেও সরকার তা প্রায় ১১ টাকা দরে বিক্রি করছে। ফলে উৎপাদন বাড়লেও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ অব্যাহত রয়েছে।

 

লোডশেডিংয়ের মধ্যেও উৎপাদন ব্যাহত

দেশের বিভিন্ন এলাকায় যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, তখন রামপালের মতো বৃহৎ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটি, জ্বালানি সংকট ও পরিচালনাগত নানা জটিলতায় কেন্দ্রটির উৎপাদন বারবার ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বাড়ছে চাপ।

 

সম্প্রতি কেন্দ্রটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

 

জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়ছে চাপ

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, কয়লা ও গ্যাস সংকটের পাশাপাশি ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়েছে লোডশেডিং।

 

এই পরিস্থিতিতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারায় বিদ্যুৎ বিভাগের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

 

বিপুল বিনিয়োগের সুফল নিয়ে প্রশ্ন

বিশ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, ১৬০ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ, উৎপাদন ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি ও ক্যাপাসিটি চার্জ—সব মিলিয়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের বড় প্রশ্ন।

 

লোডশেডিংয়ের তীব্র সংকটের সময়ে রামপালের মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন বারবার বন্ধ হচ্ছে—এর স্থায়ী সমাধান কী এবং বিপুল বিনিয়োগের কতটা সুফল জনগণ পাচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে সংশ্লিষ্ট মহল।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

August 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31