কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢালছে যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশিত: ৬:৪৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ৪, ২০২৬

কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢালছে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তজাতিক ডেস্ক ::

 

দীর্ঘদিনের টানাপড়েন নতুন মাত্রায় পৌঁছায় শনিবার যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের ভেতরে একাধিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এই হামলার মধ্য দিয়ে প্রকাশ্য সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠেছেÑ যুক্তরাষ্ট্র কি আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ সফল না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারবে এবং এর চূড়ান্ত খরচ কত হতে পারে।

 

অপারেশন এপিক ফিউরি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা আট মিনিটের এক ভিডিওতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে একটি বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযানে অংশ নিয়েছে। পরে পেন্টাগন জানায়, অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে অপারেশন এপিক ফিউরি। ট্রাম্প বলেন, এই অভিযানের উদ্দেশ্য হলো ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা।

 

 

তিনি আরও বলেন, আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করব এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প সম্পূর্ণভাবে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব। এটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, শনিবার অভিযান শুরুর পর থেকে ইরানের ভেতরে ১,২৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। পৃথক এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ১১টি ইরানি জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে।

 

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অভিযানে বিমান হামলা, সমুদ্র থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও ইরানের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ ব্যক্তিদের ওপর সমন্বিত হামলা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে দেশটি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তেহরানে তার কম্পাউন্ডে প্রথম দফার হামলায় নিহত হন।

 

 

সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, প্রয়োজন হলে এই যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া হবে। সোমবার পর্যন্ত ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানায়, দেশটির ১৩০টি স্থানে ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন।

 

 

২০২৩ সাল থেকে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের কস্ট অব ওয়ার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে।

 

 

এর পাশাপাশি, ইসরায়েলকে সমর্থন দিতে ইয়েমেন, ইরান ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালনায় মার্কিন করদাতাদের খরচ হয়েছে ৯.৬৫ বিলিয়ন থেকে ১২.০৭ বিলিয়ন ডলার।

 

 

সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় দঁঁড়িয়েছে ৩১.৩৫ বিলিয়ন থেকে ৩৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার এবং এই ব্যয় এখনও অব্যাহত রয়েছে।

 

 

ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র ব্যবস্থা

সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরিতে আকাশ, সমুদ্র, স্থল ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বাহিনী মিলিয়ে ২০টিরও বেশি অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে। ইরানের ভেতরে ১ হাজারটিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে ২০টির বেশি ভিন্ন অস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে হামলা চালানো হয়েছে।

 

 

সেন্টকমের সাবেক অপারেশন পরিচালক কেভিন ডোনেগান আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্তমান লক্ষ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেওয়া।

 

 

অভিযানে ব্যবহৃত প্রধান অস্ত্র ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বিমান শক্তি

বি-১ বোমারু বিমান, বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান (গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামোয় হামলার জন্য), এফ-৩৫ লাইটনিং-২ ও এফ-২২ র‌্যাপ্টর স্টেলথ যুদ্ধবিমান, এফ-১৫ যুদ্ধবিমান (১ মার্চ কুয়েতের আকাশে এক ঘটনায় তিনটি বিধ্বস্ত হয়), এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন, এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট, এ-১০ আক্রমণকারী জেট, ইএ-১৮জি গ্রাউলার (শত্রু আকাশ প্রতিরক্ষা দমন ও ইলেকট্রনিক আক্রমণে), এবং এয়ারবর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম।

 

 

ড্রোন ও দূরপাল্লার আঘাত ব্যবস্থা

লুকাস ড্রোন, যা লো-কস্ট আনম্যানড কমব্যাট অ্যাটাক সিস্টেম একমুখী ড্রোন হিসেবে প্রথমবারের মতো যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ইরানি নকশা থেকে রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ার করা; এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন (নজরদারি ও নির্ভুল হামলা); এম-১৪২ হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (হাইমার্স); টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।

 

 

ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও থাড (টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স), যা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে; এ ছাড়া কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা।

 

 

নৌ শক্তি

ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ; পি-৮ পোসাইডন সামুদ্রিক টহল ও নজরদারি বিমান; সি-১৭ গ্লোবমাস্টার, সি-১৩০ হারকিউলিস ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমান; যারা সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখছে।

 

 

ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য খরচ

চলমান সামরিক অভিযানের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কত খরচ হবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

 

 

স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবল আল জাজিরাকে বলেন, পেন্টাগণ এ তথ্য প্রকাশ করেনি, তাই আমরা কেবল অনুমানই করতে পারি। অনেক ভেরিয়েবল রয়েছে। আমরা পৃথক অস্ত্রের খরচ নিয়ে অনুমান করতে পারি, নৌ অভিযানের খরচ নিয়েও অনুমান করা যায়।

 

 

আনাদোলু নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার। হামলার আগে বিমান পুনর্বিন্যাস, এক ডজনের বেশি নৌযান মোতায়েন ও আঞ্চলিক সম্পদ সক্রিয়করণে অতিরিক্ত ৬৩০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে বলে অনুমান করা হয়।

 

সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনায় দৈনিক ব্যয় প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন ডলার। অভিযানে দুটি স্ট্রাইক গ্রুপ থাকায় শুধু নৌ-অভিযান পরিচালনাতেই দৈনিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি; এর বাইরে রয়েছে বিমান অভিযান, গোলাবারুদ, লজিস্টিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যয়।

 

 

কুয়েতে এক ঘটনায় অন্তত তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ‘বন্ধুসুলভ আগুন’-এর ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

 

 

অর্থ নয়, বড় উদ্বেগ অস্ত্রভান্ডার

বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক সামর্থ্যরে চেয়ে বড় উদ্বেগ হতে পারে অস্ত্রের মজুদ। যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বাড়িয়ে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার প্রস্তাব রয়েছে।

 

 

প্রেবল বলেন, খরচের দিক থেকে এটি টেকসই। এক ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের প্রকৃত মজুদÑ বিশেষ করে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র, যেমন প্যাট্রিয়ট বা এসএম-৬। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান হারে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কার্যক্রম অনির্দিষ্টকাল ধরে চালানো সম্ভব নয়। এটি যুক্তিসঙ্গতভাবে অনুমান করা যায় যে, বর্তমান হারে ইন্টারসেপশনের গতি অনির্দিষ্টকাল চলতে পারবে না, হয়তো কয়েক সপ্তাহের বেশি নয়।

 

 

তিনি উল্লেখ করেন, জুন মাসে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছিলÑ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর মজুদ ফুরিয়ে আসছে বলে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। যদিও কিছু মজুদ পুনরায় পূরণ করা হয়ে থাকতে পারে, তবুও এসব ইন্টারসেপ্টর ইউক্রেন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্যও বরাদ্দ রয়েছে।

 

 

কিছু ইন্টারসেপ্টর রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনে পাঠানোর কথা ছিল। কিছু ব্যবহৃত হয় এশিয়ায়, ইন্দো-প্যাসিফিকে। সেসব থিয়েটার থেকে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হলে উদ্বেগ তৈরি হবে।

 

 

প্লেবল আরও বলেন, একটি প্যাট্রিয়ট বা এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তির সরঞ্জাম। এগুলো প্রতিদিন শত শত বা হাজার হাজার করে তৈরি করা যায় না। উৎপাদনের গতি এত দ্রুত নয়।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

April 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930