ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান, ফের যুদ্ধে প্রস্তুত ইরান

প্রকাশিত: ৩:২০ অপরাহ্ণ, মে ৩, ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক বক্তব্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, মার্কিন নৌবাহিনী ‘জলদস্যুদের মতো’ কাজ করেছে- জাহাজ জব্দ করেছে এবং তেল দখলে নিয়েছে। তার ভাষায়, এটি ‘লাভজনক ব্যবসা’। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানকে সামরিকভাবে প্রায় ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়া হয়েছে।

 

তবে এই দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কিছুটা অমিল উঠে এসেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের বক্তব্যে। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, ইরানের নৌশক্তি পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। এখনও হরমুজ প্রণালিতে তাদের দ্রুতগামী আক্রমণ নৌযান সক্রিয় রয়েছে। এর ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা আরও জোরদার হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি এখন এই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান কার্যত এই প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং এখন সেখানে নতুন করে নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে।

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার উপকূলজুড়ে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ বলয় গড়ে তোলার কথা জানিয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বিদেশি শক্তিগুলোকে সরাসরি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এ অঞ্চলে তাদের কোনো স্থান নেই।

 

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও পিছু হটেনি। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌঅবরোধ কার্যকর করতে গিয়ে ৪৫টি জাহাজকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে ইতোমধ্যেই আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

 

ইরানের সামরিক বাহিনী সরাসরি সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কোনো সময় আবার যুদ্ধ শুরু হতে পারে এবং তারা ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন বা চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাচ্ছে না এবং আলোচনার আড়ালে আত্মসমর্পণ চাপিয়ে দিতে চাইছে।

 

ইরান আরও জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির আগে ও পরে তারা নমনীয়তা দেখালেও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবারই আরও আক্রমণাত্মক হয়েছে। ফলে তাদের দৃষ্টিতে ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের যুদ্ধ’ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

 

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কারণে তাদের পক্ষে এই যুদ্ধে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। বরং তারা হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে একটি আন্তর্জাতিক মিশন গঠনের পক্ষে। জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলর লার্স ক্লিংবাইলও ট্রাম্পের কৌশলকে তীব্র সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘জগাখিচুড়ি’ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব এখন ওয়াশিংটনেরই।

 

অন্যদিকে, পাকিস্তান ইরানের জন্য স্থলবাণিজ্য পথ খুলে দিয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক নতুন টানাপড়েনে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

আগামী ১৪ মে দুই দিনের সফরে বেইজিংয়ে পৌঁছাবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। এই বৈঠক প্রসঙ্গে জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের দূত ফু কং বলেছেন, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার প্রসঙ্গ আলোচনায় ‘জরুরি’ অগ্রাধিকার হবে। তিনি আরও বলেছেন, যদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন বেইজিং সফরের সময় প্রণালিটি বন্ধ থাকে, তবে এ বিষয়টি আলোচনার ওপরের দিকে থাকবে।

 

সংঘাতের মধ্যে কাতারকে ৪ বিলিয়ন ডলারের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইসরায়েলকে ১ বিলিয়ন ডলারের উন্নত অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।

 

যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সমালোচনাও নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। সিএনএনকে ‘নির্বোধ’ এবং নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। তার অভিযোগ, এসব গণমাধ্যম ইরানকে বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরছে।

 

তবে জনমত ভিন্নচিত্র দিচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ৬১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন- যা প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

 

যুদ্ধের ভয়াবহতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। ইরানের জানজান প্রদেশে অবিস্ফোরিত বোমা অপসারণের সময় আইআরজিসির ১৪ সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখনও ঝুঁঁকির মধ্যে রয়েছে।

 

পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য উসকানিও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। একদিকে নৌঅবরোধ, অন্যদিকে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, তার সঙ্গে কূটনৈতিক অচলাবস্থা- এসবই নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- সংঘাত কি আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবারও একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930