সিলেট ২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:২৪ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০২৬
প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন–এ আবারও আত্মসমর্পণ করলো একটি সক্রিয় বনদস্যু বাহিনী। সুন্দরবনের আলোচিত ও দুর্ধর্ষ “ছোট সুমন বাহিনী”-র প্রধান সুমন হাওলাদারসহ মোট ৭ জন দস্যু ৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২৫ রাউন্ড তাজা গুলি জমা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড–এর কাছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সদর দপ্তর চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেজবা উল ইসলামের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন তারা। এসময় কোস্ট গার্ড, বিজিবি, পুলিশ, বন বিভাগ, র্যাব এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষ অভিযানে দস্যুরা চাপে
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেজবা উল ইসলাম জানান, সুন্দরবনের সকল বনদস্যু বাহিনী নির্মূলে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” এবং “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই ধারাবাহিক অভিযানের ফলে সুন্দরবনের বিভিন্ন বনদস্যু বাহিনী বর্তমানে ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তারই অংশ হিসেবে ছোট সুমন বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়।
কোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, গত ১৭ মে রাত ১১টার দিকে মোংলার সুন্দরবনের নন্দবালা খাল সংলগ্ন এলাকায় ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সহযোগীরা অনানুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। পরে ২১ মে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ সম্পন্ন হয়।
উদ্ধার হলো অস্ত্র ও গুলি
আত্মসমর্পণের সময় দস্যুদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়—
৩টি দেশীয় একনলা বন্দুক
২টি দেশীয় পাইপগান
২৫ রাউন্ড তাজা গুলি
৩ রাউন্ড ফাঁকা গুলি
এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
“বাধ্য হয়ে আবার ডাকাতিতে নামি”
আত্মসমর্পণকারী ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদার বলেন,
“২০১৮ সালে আত্মসমর্পণের পর ব্যবসা-বাণিজ্য করে জীবন চালাচ্ছিলাম। কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর হামলা, মামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হই। ডাকাতিতে ফেরার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে আবার জড়িয়ে পড়ি।”
তিনি আরও বলেন,
“এবারও প্রায় এক বছর ডাকাতির পর সুযোগ পেয়ে আত্মসমর্পণ করলাম। আমরা চাই সরকার আমাদের মামলাগুলো সহজভাবে বিবেচনা করুক এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো হয়রানির শিকার না হই। আমরা ছোটখাটো ব্যবসা করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাই।”
“মৃত্যুভয় নিয়ে বেঁচে ছিলাম”
আত্মসমর্পণকারী অন্য সদস্যরাও জানান, বনদস্যু জীবনে তারা সবসময় আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতেন।
তাদের ভাষায়,
“সারাক্ষণ প্রশাসনের ভয়ে থাকতে হতো। ঠিকমতো খাওয়া-ঘুমও হতো না। যখন-তখন মৃত্যুর ভয় ছিল। কোস্ট গার্ড সুযোগ দেওয়ায় আমরা আত্মসমর্পণ করেছি।”
আত্মসমর্পণকারী সদস্যরা হলেন—
সুমন হাওলাদার (৩২), রবিউল মল্লিক (২৫), রফিক শেখ (২৯), সিদ্দিক হাওলাদার (৪০), গোলাম মল্লিক (৩৮), ইসমাইল খান (৩১) ও মাহফুজ মল্লিক (৩৪)। তাদের মধ্যে অধিকাংশ মোংলার বাসিন্দা এবং মাহফুজ মল্লিক রামপালের বাসিন্দা।
সুন্দরবনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকারের “জিরো টলারেন্স” নীতির আওতায় সুন্দরবনের সকল বনদস্যু বাহিনীকে দ্রুত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হচ্ছে। যারা আত্মসমর্পণ করবে তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হবে। অন্যথায় আরও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।
চলমান অভিযানে বড় সাফল্য
কোস্ট গার্ড জানায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে এখন পর্যন্ত—
২৬টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার
১০ রাউন্ড তাজা গুলি
১৭৮ রাউন্ড তাজা কার্তুজ
২৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ
১৮৭ রাউন্ড এয়ারগান গুলি
২টি ওয়াকি-টকি উদ্ধার
২১ জন বনদস্যু আটক
এছাড়া দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ২০ জনকে জীবিত উদ্ধার করে চিকিৎসা সহায়তা শেষে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, চলমান সফল অভিযানের কারণে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। তবে কোনো ধরনের অপপ্রচার বা বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা দস্যু দমন কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারবে না বলে তারা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।