সিলেট ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:২১ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২৬
প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য ও বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনকে ঘিরে আবারও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনিরঘোল এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের একটি ভাসমান স্টেশনে অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সংঘটিত এ ঘটনায় কোস্ট গার্ডের তিন সদস্যসহ অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোস্ট গার্ড সদস্যরা ফাঁকা গুলি ছুড়লে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে এবং পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে যৌথ চিরুনি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা, বনদস্যু দমন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জয়মনিরঘোল এলাকায় কোস্ট গার্ডের এই ভাসমান স্টেশনটি স্থাপন করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে এই স্টেশন সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খাল এলাকায় টহল কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বনদস্যু, চোরাকারবারি এবং অবৈধ শিকারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কারণে এটি অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, স্টেশনটি চালু হওয়ার পর সুন্দরবনের বিভিন্ন অপরাধী চক্রের রসদ, অস্ত্র ও লজিস্টিক সরবরাহের পথ অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বনদস্যু ও চোরাকারবারিদের একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে এই স্টেশন উচ্ছেদের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিল।
তিনি দাবি করেন, বৃহস্পতিবার দুপুরে সংঘবদ্ধ একদল দুষ্কৃতকারী ট্রলার ও নৌকা যোগে লাঠিসোঁটা এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে স্টেশনে হামলা চালায়। হামলাকারীরা সরকারি স্থাপনা ও সম্পত্তি ভাঙচুরের পাশাপাশি অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোস্ট গার্ড সদস্যরা পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন এবং আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি ছুড়ে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করেন।
কোস্ট গার্ডের ভাষ্যমতে, হামলায় তাদের তিন সদস্য আহত হয়েছেন। পাশাপাশি আরও একজন ব্যক্তি আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বাহিনীর পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, কোনো ধরনের হামলা, ভয়ভীতি বা অপপ্রচারের মাধ্যমে সুন্দরবন এলাকায় চলমান নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন কার্যক্রম ব্যাহত করা যাবে না।
তবে ঘটনার পেছনে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। জয়মনি এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখ নামের এক যুবক গত ১০ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি তার পরিবারের। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সিভিল পোশাকে থাকা কোনো বাহিনীর সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে যায় এবং পরে তাকে ওই ভাসমান স্টেশনে রাখা হয়েছিল বলে তারা জানতে পারেন। এরপর থেকেই মিরাজের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে নিখোঁজ মিরাজ শেখের মা তাসলিমা বেগম, স্ত্রী মুক্তা বেগম, বোন লিজা ইসলামসহ পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা মিরাজের খোঁজখবর জানতে কোস্ট গার্ডের স্টেশনে যান। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্থানীয় কিছু লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।
ঘটনার সময় ও পরবর্তীতে সৃষ্ট উত্তেজনায় কয়েকজন নারী-পুরুষও আহত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। যদিও তাদের সঠিক সংখ্যা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে শুরু করেন।
ঘটনার পরপরই মোংলা থানা পুলিশ, কোস্ট গার্ডের অতিরিক্ত সদস্য এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। বর্তমানে জয়মনি ঘোল এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং পরিবেশ শান্ত রয়েছে। কোস্ট গার্ড কর্তৃপক্ষ লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা না হলেও প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে এবং যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকেও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, শান্তি এবং স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড অতীতের মতো ভবিষ্যতেও কঠোর অবস্থানে থাকবে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং নিখোঁজ যুবক মিরাজ শেখের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুন্দরবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ও কৌশলগত অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থা ও সমন্বয় আরও জোরদার করা জরুরি।
বর্তমানে জয়মনিরঘোল ও আশপাশের এলাকায় যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান, নজরদারি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ এখনও কাটেনি। সুন্দরবনের নিরাপত্তা এবং এই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দিকে এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।