সিলেট ২০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩:৩৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::
ইসরায়েলের সংসদে বিরোধী আইনপ্রণেতাদের বিক্ষোভের মুখে কক্ষ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মার্কিন বার্তাসংস্থা সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
গত মঙ্গলবার নেসেটে ভোটাভুটির আগে বিরোধী আইনপ্রণেতারা নেতানিয়াহুকে লক্ষ্য করে ‘লজ্জা!, চলে যান!’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে প্রধানমন্ত্রী ভোটে অংশ না নিয়ে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার আগামী ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনের আগে একগুচ্ছ বিতর্কিত আইন দ্রুত নেসেটে পাস করানোর চেষ্টা করলে এ ঘটনা ঘটে। যদিও পরে তার অনুপস্থিতিতেই সরকারপক্ষ আইনগুলো পাস করাতে সক্ষম হয়।
শুক্রবার পার্লামেন্ট ভেঙে যাওয়ার আগে ইসরায়েলের সরকার যেসব আইন পাস করেছে, তার বেশিরভাগই নেতানিয়াহুর অতি-রক্ষণশীল (হারেদি) ও কট্টর ডানপন্থি জোটসঙ্গীদের দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রায় চার বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মধ্যেও নেতানিয়াহুর সরকার পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৮৮ সালের পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম সরকার, যা পুরো মেয়াদ শেষ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জোটসঙ্গীদের সন্তুষ্ট রাখার কৌশলই সরকারের এই স্থায়িত্বের মূল কারণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাদাভ আইয়াল বলেন, নেতানিয়াহু মূলত রাজনৈতিকভাবে নিজের টিকে থাকার লড়াই করছেন এবং হারেদি দলগুলো তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি তাদের দেখাতে চান, তাদের স্বার্থ রক্ষায় তিনিই একমাত্র ভরসা।
সবচেয়ে বিতর্কিত আইনটি হলো অতি-রক্ষণশীল ইহুদি (হারেদি) তরুণদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতির পথ আরও সুসংহত করা। ইসরায়েলের আইনে ১৮ বছর বয়সী প্রায় সব নাগরিকের জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক হলেও ঐতিহাসিকভাবে হারেদি পুরুষদের বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট অতীতে একাধিকবার সেই ব্যবস্থা বাতিল করেছে।
বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) অন্তত ১২ হাজার সেনার ঘাটতির কথা জানিয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৭২ হাজার সামরিক সেবার উপযুক্ত হারেদি যুবক সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি, ফলে নিয়মিত ও রিজার্ভ সেনাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যাপক জনবিরোধিতার মুখে সরকার সরাসরি অব্যাহতি আইন না এনে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে। নতুন একটি মৌলিক আইনে তোরাহ অধ্যয়নকে রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সামরিক অব্যাহতির সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে বলে সমালোচকদের আশঙ্কা। পাশাপাশি আরেকটি আইনের মাধ্যমে ২০২৭ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার হারেদি সেনা-এড়িয়ে চলা ব্যক্তিকে অস্থায়ী আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
ভোটের আগে আইডিএফ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির প্রকাশ্যে এই আইনকে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এতে যারা সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে। তার এই বক্তব্যের পর নেতানিয়াহুর মিত্ররা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। লিকুদ দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা জামিরকে বরখাস্ত করার দাবি জানান।
আইনটি পাস হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিরোধী দলগুলো হাই কোর্টে আবেদন করে। পরে আদালত আইনটির বাস্তবায়নের ওপর অস্থায়ী স্থগিতাদেশ জারি করে।
সামরিক নিয়োগ-সংক্রান্ত আইন ছাড়াও সরকার অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা সীমিত করার একটি বিল পাস করেছে। এটি সরকারের দীর্ঘদিনের বিচার বিভাগ সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে সরকার আইনি ব্যাখ্যাকে উপেক্ষা করতে পারবে এবং অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারাকে অপসারণের নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
এছাড়া সম্প্রচার খাতের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরিবর্তনের একটি আইনও পাস হয়েছে, যা সমালোচকদের মতে সরকারের গণমাধ্যমের ওপর প্রভাব বাড়াবে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী-পুরুষের পৃথক শিক্ষাক্রম সম্প্রসারণের আইনও অনুমোদন পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও নারী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত করবে, সমতা নষ্ট করবে এবং উচ্চশিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন বসতি স্থাপনের জন্য প্রায় ২৪০ কোটি শেকেল (প্রায় ৭৯ কোটি মার্কিন ডলার) বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি পূর্বের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে আরও ৩৪টি নতুন আউটপোস্টকে বৈধতা দেওয়ার কথাও জানান। তার দাবি, বর্তমান সরকারের আমলে নতুন অনুমোদিত বসতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৪টিতে।
সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ ইসরায়েলি তোরাহ অধ্যয়নকে মৌলিক আইনে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করছেন। এছাড়া ৬১ শতাংশ নাগরিক চান, আগামী সরকারে হারেদি দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত না করা হোক।
বিরোধী নেতারা বিষয়টিকে নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত করেছেন। ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট এই আইনকে “রাষ্ট্রের বিনিময়ে রাজনৈতিক জোট রক্ষার বেপরোয়া চুক্তি” বলে আখ্যা দিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও সরকারকে সেনাসদস্য, তাদের পরিবার এবং জনগণের প্রতি অবমাননা প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছেন।
তবে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী মনে করেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিতর্ক স্তিমিত হয়ে যাবে। তাদের মতে, রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ জোট ধরে রাখা যেকোনো একক আইনের অজনপ্রিয়তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং আদালতের সঙ্গে সম্ভাব্য আইনি লড়াইও সরকারের বিচারবিরোধী প্রচারণাকে আরও জোরালো করতে পারে।