সুন্দরবনের ২২৭ নদীর মধ্যে তালিকাভুক্ত হচ্ছে প্রায় ৮০টিনদ-নদী নির্ধারণে বিভ্রান্তি সরকারি তালিকায়,জরিপের দাবি গবেষকদের

প্রকাশিত: ৩:১৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০২৬

সুন্দরবনের ২২৭ নদীর মধ্যে তালিকাভুক্ত হচ্ছে প্রায় ৮০টিনদ-নদী নির্ধারণে বিভ্রান্তি সরকারি তালিকায়,জরিপের দাবি গবেষকদের

প্রতিনিধি / বাগেরহাট ::

 

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ হয়নি। অন্যদিকে সুন্দরবনের অনেক নদী কোথাও কোথাও সরু খালের মতো প্রবাহিত হওয়ায় বন বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে সেগুলোকে খাল হিসেবে তালিকাভুক্ত করে আসছে। তবে গবেষকদের একটি বড় অংশের দাবি, সুন্দরবনের এসব প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ প্রকৃতপক্ষে নদী এবং এ হিসাবে বনাঞ্চলে বর্তমানে ২২৭টি নদীর অস্তিত্ব রয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রণীত জাতীয় নদ-নদীর তালিকায় আপাতত সুন্দরবনের প্রায় ৮০টি নদীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বাকি নদীগুলো পর্যায়ক্রমে জরিপের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হবে।

 

সুন্দরবনের নদ-নদী তালিকাভুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “সুন্দরবনের অনেক এলাকায় এখনো ভূমি জরিপ হয়নি। আমরা সেসব নদীর নামই তালিকাভুক্ত করছি, যেগুলো কোনো না কোনো সরকারি রেকর্ডে রয়েছে। রেকর্ডের বাইরে থাকা নদীগুলো জরিপ ছাড়া তালিকাভুক্ত করার সুযোগ নেই।”

 

খুলনা বিভাগের নদ-নদীর তালিকা প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নদীকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনের নদী ও খালের সংজ্ঞা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মতভেদ রয়েছে। তাছাড়া এ বনাঞ্চলের নদ-নদীর সংখ্যা নির্ধারণে এর আগে কোনো সরকারি জরিপ না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে।

 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) খুলনা জেলার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম বলেন, “নদীকর্মীরা আমাদের সুন্দরবনের নদ-নদীর একটি তালিকা দিয়েছেন। যাচাই-বাছাই শেষে খুলনা অংশে ২৯টি নদী অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনেক নদীর একাধিক নাম পাওয়া গেছে। কোথাও স্থানীয় নাম, কোথাও কেতাবি নাম রয়েছে। আমরা স্থানীয় নামকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। বন বিভাগের তালিকায় যেগুলো খাল হিসেবে উল্লেখ আছে, সেগুলো আপাতত খালের তালিকায় রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে কোনো নদী বাদ পড়ে থাকলে তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”

 

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সারা দেশের নদ-নদীর তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। গত বছরের ডিসেম্বরে ১ হাজার ১৫৬টি নদীর একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই শেষে চলতি বছরের ২৭ মার্চ ১ হাজার ২৯৪টি নদীর নাম প্রকাশ করা হয়। শিগগিরই দেশের নদ-নদীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে।

 

পাউবো সূত্র জানায়, ব্রিটিশ আমলে বন অধিদপ্তর সুন্দরবনের নদ-নদীর একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিল। ওই তালিকায় অধিকাংশ নদীকেই খাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে খুলনা অঞ্চলের নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকির দাবি, সুন্দরবনে প্রকৃত অর্থে কোনো খাল নেই; বরং বহু নদীকে ভুলভাবে খাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

তিনি বলেন, “অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা মৌয়াল, বাওয়াল ও জেলেদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে নদীর তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন। স্থানীয়রা দুটি নদীর সংযোগস্থলকে ‘ভারানী’ বা ‘খাল’ বলতেন। কিন্তু এগুলো আসলে খাল নয়, নদী। আবহমানকাল ধরে এগুলো নদী হিসেবেই প্রবাহিত হচ্ছে।”

 

সুন্দরবনের উল্লেখযোগ্য নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে শিবসা, পশুর, হরিণঘাটা, মালঞ্চ, কুঙ্গা, বাংড়া, আড়পাঙ্গাশিয়া, খোলপেটুয়া, রায়মঙ্গল, হাড়িয়াভাঙ্গা, যমুনা ও মেঘনা।

 

মাহবুব সিদ্দিকি আরও বলেন, “হাড়িয়াভাঙ্গা, রায়মঙ্গল, ইছামতি, ভদ্রা, হরিণঘাটা, কুঙ্গা, মরজাদ, বাংড়া, মালঞ্চ, পশুর, শিবসা, আড়পাঙ্গাশিয়া, চুনার, ভোলা, আরুয়া শিবসা ও শেলাসহ প্রায় ৫০টি বড় নদীকে বন বিভাগ খাল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অথচ আন্তর্জাতিক জরিপ ও মানচিত্রে এগুলোর অধিকাংশই নদী হিসেবে স্বীকৃত।”

 

২০২৩ সালে প্রকাশিত তার ‘সুন্দরবন ও গাঙ্গেয় বদ্বীপের মোহনা’ গ্রন্থে সুন্দরবনের ২২৭টি নদীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জানান, এর আগে বাংলাপিডিয়া, ন্যাশনাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব বাংলাদেশ এবং এশিয়াটিক সোসাইটির যৌথ গবেষণায় ১৭৭টি নদীর নাম পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে আরও ৫০টি নদীর তথ্য সংগ্রহ করে তিনি মোট ২২৭টি নদীর তালিকা প্রস্তুত করেন।

 

খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সাতটি জেলায় সুন্দরবনের বিস্তৃতি রয়েছে। এর মধ্যে খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সুন্দরবন বিস্তৃত। এছাড়া নোয়াখালীর দক্ষিণে নতুন নতুন দ্বীপ জেগে ওঠায় সেখানে নতুন বনাঞ্চলও গড়ে উঠছে।

 

রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, “সুন্দরবনের বহু জলপ্রবাহ স্থানীয়ভাবে খাল নামে পরিচিত হলেও বৈশিষ্ট্যগতভাবে সেগুলো নদী। নদী প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি ও প্রবাহিত হয়, আর খাল সাধারণত মানুষের তৈরি। সুন্দরবনের সব জলপ্রবাহই প্রাকৃতিক। তাই রাষ্ট্র চাইলে এগুলোকে নদী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে।”

 

গত ২৭ মার্চ প্রকাশিত ১ হাজার ২৯৪টি নদীর খসড়া তালিকায় সুন্দরবনের অনেক নদীর নাম না থাকায় নদী গবেষক ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে সমালোচনা দেখা দেয়। পরে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে সুন্দরবনের খুলনা অংশের ২৯টি নদীসহ মোট ৭০ থেকে ৮০টি নদী তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

পরিকল্পনা-১ পরিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) ড. রবীন কুমার বিশ্বাস বলেন, “খুলনা অঞ্চলের ২৯টি নদীসহ সুন্দরবনের মোট ৭০-৮০টি নদী তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে জরিপের ভিত্তিতে আরও নদ-নদী অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930