ওসমানীনগরে সামাদ হত্যাকান্ড, পিতার অপেক্ষায় পথ চেয়ে শিশু আদিরা

প্রকাশিত: ৯:১৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৪, ২০২৬

ওসমানীনগরে সামাদ হত্যাকান্ড, পিতার অপেক্ষায় পথ চেয়ে শিশু আদিরা

প্রতিনিধি/ওসমানীনগরঃঃ
পিতার অপেক্ষায় ১৫ মাস বয়সী আদিরা জান্নাত। পিতা ফিরে আসবে আবারো মমতায় কুলে তুলে নিবে। কিন্তু তার জানা নেই তার পিতা আর ফিরবে না, আদরে আর তাকে কুলে নিবে না। শিশু আদিরার মতোও পথ চেয়ে নিহত সামাদের স্ত্রী ডলি বেগম। ডলি বেগমের স্বামী সামাদ ফিরেছেন তবে প্রাণহীন নিথর দেহ নিয়ে। কবরের পাশে বসে ভাই জাবেল মিয়ার আকুতি। ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে আর্থনাত বৃদ্ধা মা সৈয়দুন বিবির।

 

সড়জমিনে নিহত সামাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা মিলে এই দৃশ্যের। ওসমানীনগর উপজেলার উসমানপুর ইউনিয়নের কিত্তে কমরপুর (সিকন্দরপুর) গ্রামে শালিশ বৈঠককে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত আব্দুল সামাদ হত্যকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার। হত্যাকান্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তসহ বেশ কয়েকজন পলাতক থাকলেও তারা প্রকাশ্যে রয়েছেন বলে দাবি নিহত সামাদের পরিবারের।

 

এর আগে, শুক্রবার ৬ মার্চ রাতে তারাবির নামাজের শেষে একটি শালীশ বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে একই গ্রামের আব্দুল খালিকের পুত্র আব্দুল সামাদ নিহত হন। পেশায় কাটমিস্ত্রী  সামাদ স্থানীয় মাদার বাজারে একটি দোকানে কর্মরত ছিলেন।

 

নিহত সামাদের স্ত্রী ডলি বেগম হত্যাকান্ডের ঘটনায় একই গ্রামের শাকিল মিয়াসহ ১৩ জনের নাম উল্ল্যেখ এবং আরো ৪-৫জনকে অজ্ঞাত আসামী করে ৮ মার্চ ওসমানীনগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকান্ডে ঘটনায় ৯দিন অতিবাহিত হলেও প্রধান অভিযুক্ত শাকিল মিয়াসহ বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার না হওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন নিহত সামাদের পরিবার।

 

তবে, দুই পক্ষের সংঘর্ষে সামাদ নিহত হওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষনিক অভিযান চালিয়ে ৬জনকে গ্রেপ্তার করেছে। মামলায় বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রযেছে বলে জানিয়েছে ওসমানীনগর পুলিশ।

 

মামলা ও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, ৫ মার্চ বৃহস্পতিবার ইফতারের আগে উপজেলার উসমানপুর ইউনিয়নের কিত্তেকমরপুর গ্রামের আব্দুল সামাদ ও রফিকুল ইসলামের মধ্যে পারিবারিক রাস্তা নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। উভয় পক্ষের বাড়ির পাশাপাশি হওয়ায় কথা কাটাকাটি এবং রাস্তা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে শুক্রবার দিবাগত রাতে তারাবির নামাজের পর একই গ্রামে মাসুক মিয়ার বাড়িতে শালিশ বৈঠক বসে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ উভয় পক্ষকে নিয়ে সালিশ বৈঠকের শেষ পর্যায়ে হঠাৎ করে উভয় পক্ষ উত্তেজিত হয়ে দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। এসময় উভয় পক্ষের ১০-১২ জন গুরুত্বর আহত হন। সংঘর্ষে ধারালো চাকুর আঘাতে ঘটনাস্থলে গুরুতর আহত হন আব্দুল সামাদ। তাকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিক বালাগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

 

নিহত সামাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামবাসীরা উপস্থিত হয়ে সামাদের মা সৈয়দুন বিবিকে শান্তনা দিচ্ছেন। পুত্রকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা সৈয়দুন বিবি। ১৫ মাসের সন্তান আবিদাকে কুলে নিয়ে নিস্তব্ধ সামাদের স্ত্রী ডলি বেগম। সামাদের কবরের পাশে বসে আছেন ভাই জাবেল মিয়া।

 

নিহত সামাদের মা সৈয়দুন বিবি স্ত্রী ডলি বেগম ও ভাই জুবেল মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, পার্শবর্তী বাড়ির বাসিন্দা লেবু মিয়া, আনহার, আবুল হোসনে , হিরণ মিয়াসহ বেশ কয়েকজনের সাথে রাস্তায় চলাচল নিয়ে পূর্ব বিরোধ চলে আসছিল সামাদের পরিবারের। ৭-৮ মাস আগে লেবু মিয়ার নির্দেশে ওই রাস্তায় পাকা দেয়াল নির্মান করে চলাচলে বাধা সুষ্টি করা হয় সামাদের পরিবারের। পরে পার্শবর্তী রফিকুল ইসলামের বিকল্প রাস্তায় চলাচল করেলে ওই রাস্থায়ও বাধা প্রাপ্ত হন তারা। রাস্তা দিয়ে নির্মাণ সামগ্রী আনলে রফিকুল ইসলামের সাথে পুনরায় বিরোধ সৃস্টি হয়। এই নিয়ে শালীশ বৈঠকে প্রাণ হারান সামাদ।

 

এদিকে, সামাদ নিহত হওয়ার পর গ্রামবাসীরা রাস্তায় লেবু মিয়ার নির্মাণকৃত পাকা দেয়ালটি ভেঙ্গে সামাদের পরিবারের সদস্যসহ অন্যান্যদের উন্মক্ত করে দেন।

 

নিহতের পরিবার ও গ্রামবাসীদের দাবি, ভালো ভাবে বৈঠক নিষ্পত্তি হচ্ছিল। হঠাৎ তুচ্চু কথাকাটাকাটি নিয়ে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়ান। সংঘর্ষ চলাকালে শাকিলের ধারালো চাকুর আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে পড়েন সামাদ। মাত্র ৫ মিনিটের সংঘর্ষে প্রাণ হারান সামাদ। সংঘর্ষে আহত হন নিহত সামাদের ভাই জুবেল মিয়া, জাবেল মিয়া, চাচাতো ভাই সোহেল মিয়া, আলী হোসেন, মিজান মিয়া, আব্দুর রূপ, হীরা মিয়া, চাচা গপ্পার মিয়াসহ বেশ কয়েকজন।

 

ঘটনার পর পরই থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে একই গ্রামের রফিক মিয়া, শফিক মিয়া, আব্দুল কাহির, আব্দুস সত্তার, আব্দুস সামাদ রাহিল, জায়েদ মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। তবে, বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে থানা পুলিশের প্রতি আহবান জানিয়েছেন নিহত সামাদের পরিবারসহ গ্রামবাসী।

 

নিহত সামাদের ভাই জাবেল মিয়া জানান, সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষনিক ৬জনকে আটক করলেও মামলা দায়ের হওয়ার পর থেকে পুলিশ আর কোন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারছে না। আমার ভাইয়ের খুনিদের আইনের আওতায় আনার জন্য আমি প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানাই।

 

এই বিষয়ে ওসমানীনগর থানার অফিসার ইনচার্য মুরশেদুল আলম ভূইয়া বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ ৬জনকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। আশা করছি শিগ্রই বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হবে।

 

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031