সিলেট ১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩:২০ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::
ইরানে চলমান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তার ওপর গুরুতর আঘাত হানছে। বিশ্ব খাদ্য সহায়তা সংস্থার (ডব্লিউএফপি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান কার্ল স্কাউ সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সরবরাহ সংকটের ফলে আরও কোটি কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারেন।
আজ বুধবার মার্কিন বার্তাসংস্থা সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
তার মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এতে খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয় অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দামও বাড়ছে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিভিন্ন দেশে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে সুদানের মতো দেশে খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
কার্ল স্কাউ বলেন, ‘অনেক এলাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য বরাদ্দ খাদ্য কমিয়ে আরও সংকটাপন্ন মানুষকে সহায়তা দিতে হচ্ছে। আমরা অনেক জায়গায় ক্ষুধার্তদের কাছ থেকে খাদ্য নিয়ে অনাহারীদের দিচ্ছি।’
সংস্থাটি মূলত বিভিন্ন দেশের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনুদানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে তাদের সবচেয়ে বড় দাতা দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাও আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
স্কাউ জানান, দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্যের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে গেলে মানুষ বাধ্য হয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কম খাবার খায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশু, নারী ও বয়স্কদের ওপর।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, তেলের মূল্য উচ্চ অবস্থায় থাকলে আগামী জুলাইয়ের মধ্যে আরও সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কা, সোমালিয়া ও আফগানিস্তানে এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি যদি আগামীকালই খুলে দেওয়া হয়, তবুও বর্তমান সংকটের প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূত হবে। কারণ সরবরাহব্যবস্থা ও বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে।
বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সুদানে প্রায় দুই কোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীন অবস্থায় রয়েছে। লেবাননে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইউক্রেনেও খাদ্য সহায়তা কেন্দ্র ও গুদামগুলো একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে।
অর্থসংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে বলে জানান স্কাউ। দক্ষিণ সুদানের দুর্ভিক্ষপীড়িত কিছু এলাকায় শুধু আকাশপথে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব, কিন্তু এর ব্যয় অত্যন্ত বেশি। ফলে এক অঞ্চলে সহায়তা অব্যাহত রাখলে অন্য জরুরি এলাকাগুলো বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
আফগানিস্তান সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সেখানে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে কারা অগ্রাধিকার পাবে তা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সব অসহায় পরিবারকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি ধনী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাদের আরও এগিয়ে আসতে হবে। কারণ ক্ষুধা ও অনাহার শুধু মানবিক সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।’
স্কাউ বলেন, ‘একটি ক্ষুধার্ত পৃথিবী কখনোই স্থিতিশীল পৃথিবী হতে পারে না। কোনো শিশুর ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়া বা অনাহারে মারা যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।’
বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা সংঘাত, জ্বালানি সংকট এবং সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই গভীর হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন মানবিক সহায়তা বিশেষজ্ঞরা।